মাটির কাছ থেকে বৈশ্বিক পরিসরে: সুজিত চৌধুরীর সৃষ্টিশীল যাত্রা
ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এক পাড়ায় জন্ম নেওয়া এক তরুণের গল্প—যাঁর নাম সুজিত চৌধুরী, কিন্তু পরিবার, বন্ধু ও আত্মীয়দের কাছে যিনি পরিচিত তুষার নামে। এই নামেই তাঁকে ডাকা হয় ভালোবাসা, আড্ডা আর স্মৃতির ভেতর দিয়ে। রাজধানীর কোলাহলের মাঝেই তাঁর শৈশবের শেকড় গাঁথা, যদিও পারিবারিক শিকড় বিস্তৃত ফরিদপুরে। বাবা বাবলু চৌধুরী ও মা বেবি চৌধুরী ফরিদপুর থেকে ঢাকায় চলে আসেন তাঁর জন্মের আগেই—জীবিকার টানে, ভবিষ্যতের আশায়।
দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সুজিত বেড়ে উঠেছেন মধ্যবিত্ত এক পরিবারে। বর্তমানে তাঁর ভাই বোনেরা পৃথিবীর দ’টো উন্নত রাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, কিন্তু শৈশবের দিনগুলো ছিল একসঙ্গে কাটানো সাধারণ অথচ গভীর অভিজ্ঞতায় ভরা। নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক শ্রেণির মানুষের সহাবস্থানে গড়ে ওঠা এলাকায় বড় হওয়ায় খুব ছোট বয়সেই তিনি বাস্তব জীবনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। এই পরিবেশই তাঁকে শিখিয়েছে বিনয়, বাস্তবতা আর মাটির কাছাকাছি থাকার দর্শন—যা আজও তাঁর চিন্তা ও কাজে প্রতিফলিত।
পেশায় ব্যবসায়ী বাবা এবং গৃহিণী মায়ের স্বপ্ন ছিল—তাঁদের সন্তান একদিন ডাক্তার হবে। কিন্তু সুজিতের মন সেই নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকেনি। তাঁর মন ছুটে যেত অন্যদিকে—সৃষ্টিশীলতার দিকে। সংগীত, বাদ্যযন্ত্র আর নিজের হাতে কিছু তৈরি করার আনন্দ তাঁকে আলাদা করে টানত। এই জায়গায় সবচেয়ে বড় অবদান ছিল তাঁর মায়ের। ছেলের আগ্রহকে তিনি কখনো বাধা দেননি; বরং উৎসাহ দিয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন।
এই উৎসাহের ফলেই সুজিত ভর্তি হন নজরুল একাডেমিতে, যেখানে তিনি তবলা শেখেন। সুর ও তালের জগতে তাঁর নিষ্ঠা খুব দ্রুতই স্বীকৃতি পায়। তিনি অর্জন করেন একাধিক পুরস্কার, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার। এই অর্জন শুধু একটি পদক ছিল না—এটি ছিল নিজের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস জন্মানোর প্রথম ধাপ। তার সাথে সাথে তার চিত্রকলার প্রতি ছিল প্রচন্ড দূর্বলতা। তিনি ছোটবেলা থেকে ছবি আকা শেখেন এবং এই অঙ্গনেও অর্জন করেন বেশ কিছু পুরস্কার।
সংগীত আর ছবি আকার পাশাপাশি তাঁর আরেকটি নেশা ছিল—কার্ডবোর্ড দিয়ে বাড়ি বানানো। স্থাপত্য সম্পর্কে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা না থাকলেও তিনি খেলাচ্ছলেই তৈরি করতেন বিভিন্ন কাঠামোর মডেল। তখনো তিনি জানতেন না, এই খেলাই একদিন তাঁর জীবনের দিকনির্দেশনা ঠিক করে দেবে।
স্কুল ও কলেজ জীবন শেষে তিনি সিদ্ধান্ত নেন স্থাপত্যবিদ্যা পড়ার। এটি ছিল প্রচলিত প্রত্যাশার বাইরে এক সাহসী সিদ্ধান্ত। তবে এই সিদ্ধান্তে তিনি পেয়েছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের পূর্ণ সমর্থন—যা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে তাঁর সৃষ্টিশীল মন নতুন ভাষা খুঁজে পায়। নকশা, স্থান, আলো-বাতাস আর মানুষের ব্যবহার—সবকিছু মিলিয়ে স্থাপত্য তাঁর কাছে হয়ে ওঠে জীবন বোঝার এক মাধ্যম।
২০১৪ সালে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক থেকে স্নাতক শেষ করে তিনি যোগ দেন ঢাকায় অবস্থিত একটি স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান আর্কিওয়ার্ক্স কন্সালন্টেটস এ ইন্টার্ন হিসেবে। এখান থেকেই শুরু হয় বাস্তব পেশাগত জীবনের শিক্ষা। মৌলিক ক্লায়েন্ট, বাস্তব বাজেট আর সীমাবদ্ধতার ভেতরে দাঁড়িয়ে নকশা করার চ্যালেঞ্জ তাঁকে প্রতিদিন নতুন করে শিখিয়েছে। তিনি উপলব্ধি করেন— ‘স্থাপত্য সব শিল্পের মূল’—কারণ এর ভেতরেই আছে চিত্রকলার নান্দনিকতা, ভাস্কর্যের গঠন, সংগীতের ছন্দ এবং গণিতের শৃঙ্খলা; তাই একটি নকশা শুধু সৌন্দর্যপূর্ণ হলেই যথেষ্ট নয়, সেটি হতে হবে গঠনগত ও ব্যবহারিকভাবে সঠিক।
সিনিয়র ও সহকর্মীদের কাছ থেকে শেখার মধ্য দিয়ে অল্প সময়েই তিনি নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন। ইন্টার্নশিপ চলাকালীনই তিনি পান একটি নয়তলা আবাসিক ভবনের নকশা করার সুযোগ, ঢাকার একটি আবাসিক এলাকায়। ভবনটি প্রশংসিত হয় শুধু বাহ্যিক নকশার জন্য নয়, বরং অভ্যন্তরীণ স্পেস কোয়ালিটি, আলো-বাতাস চলাচল ও যুক্তিসংগত বিন্যাসের জন্য। এই অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত আত্মবিশ্বাসকে দৃঢ় করে।
পরবর্তী নয় বছর তিনি যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও হাসপাতাল প্রকল্পে। তবে তিনি এখানেই থেমে থাকতে চাননি। নিজের দক্ষতাকে আরও বিস্তৃত করতে তিনি মনোযোগ দেন থ্রিডি ডিজাইন ও ভিজ্যুয়ালাইজেশনের দিকে। আধুনিক সফটওয়্যার আয়ত্ত করে তিনি এই ক্ষেত্রেও নিজেকে প্রস্তুত করেন।
২০১৭ সালে এক বন্ধুর কাছ থেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কথা শুনে তিনি নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার খুঁজে পান। তিনি নিবন্ধন করেন Fiverr ও Upwork–এ। শুরু করেন CAD Specialist ও 3D Designer হিসেবে কাজ। মাত্র এক বছরের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন Top Rated Freelancer। বিশ্বের নানা প্রান্তের ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজ করে তিনি বুঝতে শেখেন আন্তর্জাতিক নকশার বাস্তবতা—যা আগে শুধু বই আর ম্যাগাজিনেরপাতায় বদ্ধ ছিল।
আজ পর্যন্ত তিনি করেছেন ৭০০–এর বেশি প্রজেক্ট এবং প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখেছেন। অস্ট্রেলিয়ান এক ক্লায়েন্টের জন্য ক্রোয়েশিয়ায় একটি ভ্যাকেশন হাউস ডিজাইন ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় কাজ। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি ফুল-টাইম ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ শুরু করেন।
২০২১ সালে তিনি যুক্ত হন সহপাঠীর প্রতিষ্ঠিত ‘Senscape Architects’–এ, Associate Partner হিসেবে। সেখানে তিনি থ্রিডি ডিজাইন ও ভিজ্যুয়ালাইজেশন বিভাগের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি বেক্সিমকো গ্রুপের Yellow Café, Yellow Retails–সহ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য প্রকল্পে কাজ করেন এবং ২০২২ সালে সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি এক্সপোতে Broadwayschapmen Ltd. এর জন্য করা একটি স্টল ডিজাইনে তাঁদের প্রতিষ্ঠান অর্জন করে দিতীয় পুরস্কার।
২০২৩ সালের শেষদিকে তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। বর্তমানে তিনি ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের হাডার্সফিল্ডে বসবাস করছেন। এখানে তিনি কাজ করার সুযোগ পান একটি গ্রাফিক্স ডিজাইন ফার্ম ‘The Design Bank’–এর সঙ্গে। ধীরে ধীরে নিজেকে আরও প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আজ সুজিত চৌধুরীর লক্ষ্য—একটি বিশেষায়িত Architectural 3D Design & Visualization Studio গড়ে তোলা। তাঁর এই দীর্ঘ পথচলার শেষ লক্ষ্য একটাই—নিজের কাজ দিয়ে এমন কিছু তৈরি করা, যাতে তাঁর বাবা-মা গর্ব করে বলতে পারেন, তাঁদের সন্তান নিজের স্বপ্নের পথ নিজেই তৈরি করেছে।
Rp / Rp
লালমনিরহাটে ১৫ বিজিবির অভিযানে ভারতীয় ৯৮ বোতল ইস্কাফ সিরাপ জব্দ
বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার মায়ের ইন্তেকাল
মাটির কাছ থেকে বৈশ্বিক পরিসরে: সুজিত চৌধুরীর সৃষ্টিশীল যাত্রা
ক্ষোভ ও সম্পত্তির ভাগ পেতে শিশু শামস্কে হত্যা করেছে তার আপন চাচাতো ভাই
দিনাজপুরে চাঞ্চল্যকর শিশু সামস্ হত্যাকাণ্ডে আটক চাচাতো ভাই আমান আটক
সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার বাবা ইস্কান্দর মজুমদার, মা তৈয়বা মজুমদার ও বড় বোন খুরশীদ জাহান হকের কবর জিয়ারত করেন -- সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডাঃ এ জেড এম জাহিদ হোসেন
অবৈধ বালু মহাল চালু ও পাথর উত্তোলন করা যাবে না -- মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী
দিনাজপুরে সাত বছরের শিশুকে হত্যা: বইছে শোকের মাতম
লালমনিরহাটে ট্রাকের চাপায় ওয়ালটন শোরুমের ম্যানেজার নিহত
নোয়াখালীতে নিখোঁজের ২ দিন পর ডোবায় মিলল শিশুর মরদেহ
দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে রপ্তানির উপযোগী করতে কাজ করছে সরকার -- প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু
বেতনে না পোষালে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী চাকুরী ছেড়ে চলে যেতে বললেন শৈলকুপায় মতবিনিময় সভায় আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান